Templates by BIGtheme NET
Home » জেলার খবর » ধর্মঘটে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা

ধর্মঘটে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা

চট্টগ্রাম : শ্রমিক-মালিক পাল্টাপাল্টি ধর্মঘটে হুমকির মুখে পড়েছে নৌপথে পণ্য পরিবহন। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে দেশের ভোগ্যপণ্যসহ বিদেশি কাঁচামালনির্ভর শিল্পপণ্যের বাজার। শঙ্কা দেখা দিয়েছে, আসন্ন রমজানে পণ্য সরবরাহ হুমকির মুখে পড়বে।

বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও নৌপথে চুরি-ডাকাতি বন্ধসহ ১৫ দফা দাবিতে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ জাহাজী শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে ২০ এপ্রিল বুধবার রাত ১২টা থেকে ধর্মঘট শুরু করে। পরে টানা ৬ দিন ধর্মঘট পালন শেষে নৌমন্ত্রীর আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন নৌযান শ্রমিকরা। কিন্তু জাহাজ মালিকরা বর্ধিত মজুরি দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করলে পোষাতে পারবেন না, এ অভিযোগ তুলে ২৬ এপ্রিল (মঙ্গলবার) থেকে পাল্টা ধর্মঘটের ডাক দেন।

বন্দর সূত্র জানা গেছে, আজ রোববার পর্যন্ত পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আছে ৮১টি দেশি-বিদেশে জাহাজ ও মাদার ভ্যাসেল। এর মধ্যে রয়েছে রমজানের পণ্য নিয়ে আসা ১৭টি জাহাজও, কিন্তু জাহাজ মালিকদের ধর্মঘটের কারণে খালাস করতে পারছে না পণ্য। পাল্টাপাল্টি ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের দেশি-বিদেশি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে গত ১২ দিন।

বহির্নোঙরে এখন গমবোঝাই সাতটি জাহাজ রয়েছে। রমজানকে সামনে রেখে আমদানি করা চিনিবোঝাই জাহাজও রয়েছে দুইটি। বিভিন্ন ধরনের তেলবোঝাই জাহাজ রয়েছে আটটি। এর মধ্যে দুইটি ক্রড ওয়েল ও একটি সয়াবিনের জাহাজ। এ ছাড়া সার, চিনি, লবণ, গম, সরিষা, ক্লিংকার, জিপসামসহ বিভিন্ন আমদানি পণ্যবোঝাই জাহাজও অপেক্ষমাণ রয়েছে। এক-একটি জাহাজের বিপরীতে আমদানিকারকদের কোটি কোটি টাকা গচ্ছার কবলে পড়তে হচ্ছে। ৮ মে-র মধ্যে আরও ৪৬টি জাহাজবহির্নোঙরে নোঙর করবে বলে জানিয়েছে বন্দর সূত্র।

 

শুধু যে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে তা নয়, পণ্য খালাস হচ্ছে না ঘাটে থাকা লাইটারেজ জাহাজ থেকেও। সূত্র জানায়, দুই হাজার ৫০০ টন গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে আসাম বেঙ্গল ঘাটে আসে ‘পেয়ারা-৬’ নামের একটি লাইটারেজ জাহাজ। কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও মালিক-শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটে অর্ধেকেরও বেশি গম এখনো খালাস করা যায়নি।

এই লাইটারেজটির মতো সারাদেশের নৌঘাটগুলোতে প্রায় সাত লাখ ৭৯ হাজার টন পণ্য নিয়ে আটকে আছে ৬৩১টি জাহাজ। যেখানে বোঝাই রয়েছে ভোগ্যপণ্য, খাদ্যশস্য ছাড়াও জ্বালানি তেলের মতো বিভিন্ন জরুরি পণ্যও। পাশাপাশি সারাদেশে অলস পড়ে আছে প্রায় দুই হাজার ১০০টি লাইটারেজ জাহাজ।

আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ অবস্থার নিরসন না হলে অচিরেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা দেবে কাঁচামাল সংকট। এ ছাড়া, জ্বালানি সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় এর প্রভাব পড়ছে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনেও।

চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বাংলামেইলকে বলেছেন, ‘পাল্টাপাল্টি ধর্মঘটের কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজার ইতোমধ্যেই চড়তে শুরু করেছে। এ অচলাবস্থা চলতে থাকলে তা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দামে এর প্রভাব পড়বে।’

এদিকে গত কয়েক দিনের ধর্মঘটে এরই মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক কমে গেছে। পিডিবির পরিচালক সাইফুল হাসান চৌধুরী জানান, বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাঁচামাল নৌপথে আসে। টানা ধর্মঘটের কারণে সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।

তবে জাহাজ মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বর্ধিত মজুরি দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করে তারা পোষাতে পারবেন না। তাই জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

 

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম বাংলামেইলকে বলেন, ‘প্রতি মাসে একটি জাহাজের ট্রিপ হয় একটি। প্রতি ট্রিপে মোট আয় হয় ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা জ্বালানি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয় আরো ২০ হাজার। শ্রমিকদের বেতন দিতে হয় ১ লাখ ২০ হাজার। এর বাইরে বছরে একটি সার্ভে করাতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় আরো ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা অর্থাৎ গড়ে মাসে ১ লাখ টাকা।’

‘এ অবস্থায় শ্রমিকদের সরকার নির্ধারিত বেতন-ভাতা দিতে গেলে বাড়তি আরো ১ লাখ ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা প্রয়োজন। নিজের লোকসান করে কে জাহাজ চালাবে? জাহাজ থেকে আমাদের বেতন দিতে হবে, সরকার আমাদের বেতন দেবে না। তাই শ্রমিকদের মজুরি পুনরায় নির্ধারণ করা হোক’, বলেন জাহাঙ্গীর আলম।

এদিকে জাহাজ মালিকদের এ যুক্তি মানতে নারাজ শ্রমিক নেতারা। তারা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন, মালিকরা এ খরচে জাহাজ চালাতে না পারলে শ্রমিকদের দিয়ে দিক, কীভাবে জাহাজ চালাতে হয়, দেখিয়ে দেবেন তারা।

লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহীম বাংলামেইলকে বলেন, ‘বছর পাঁচেক আগেও যারা একটি জাহাজের মালিক ছিলেন তারা আজ তিনটি জাহাজের মালিক। যার জাহাজ ছিল হাজার টনের, আজ তা দুই থেকে তিন হাজার টনের। জাহাজ চালিয়ে যদি না পোষায় একেকজন একটি থেকে পাঁচটি জাহাজের মালিক কীভাবে হন? জাহাজ সরকারের জিম্মায় আমাদের দেয়া হোক, দেখিয়ে দেব কীভাবে সব খরচ মিটিয়ে জাহাজ চালাতে হয়।’

Facebook Comments Box