Templates by BIGtheme NET
Home » জাতীয় » ঈশ্বরদীর রূপপুর যেন একখণ্ড রাশিয়া

ঈশ্বরদীর রূপপুর যেন একখণ্ড রাশিয়া

ক্রাইমভিশনবিডি ডেস্ক:

 

দেশের আর পাঁচটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামের মতই ছিল পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুর। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ছিল শান্ত, স্থির ও স্বাভাবিক। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হতো এই গ্রাম। একই অবস্থা বিরাজমান ছিল এর আশেপাশের গ্রামগুলোরও। কিন্তু এখন চিত্র সম্পূর্ণই অন্যরকম। কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি এই অজগাঁয়ে অত্যাধুনিক ২০তলা ভবন নির্মাণ হবে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরুর পর গত কয়েক বছরে সেখানে গড়ে উঠেছে নানা অবকাঠামো। পাশাপাশি রুশভাষাভাষী কয়েক হাজার বিদেশি কর্মীদের অবস্থানে সেখানকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রভাপ পড়েছে রাশিয়ার ভাষা ও সংস্কৃতির। এলাকার রিসোর্টগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অনেক রুশ নাগরিক অবসর সময় কাটাচ্ছেন।

পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতুর পাশেই নদীতীরে চলছে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের সবচেয়ে মেঘা প্রকল্পের কাজ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ শুরুর পর থেকে বদলে যেতে থাকে এলাকার চিত্র। ফলে পাবনার রূপপুর যেন একখন্ড’রাশিয়া। পাল্টে যায় জীবনযাত্রার মান।

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের কল্যাণে এলাকার দৃশ্যপট পুরোটাই পাল্টে গেছে। এলাকার-বিপণিবিতান, বিদ্যালয়, সুউচ্চ ভবন, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-রেস্টুরেস্ট, রিসোর্ট এখন মুখরিত। এখানকার কাঁচা বাজারগুলোতেও যেন রাশিয়ানদের ছোঁয়া লেগেছে। এর বাইরে চারপাশে গড়ে ওঠা হোটেল, রিসোর্ট, বিপণিবিতানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো কর্মহীন মানুষের। বিদেশি নাগরিকদের কেনাকাটাসহ দৈনন্দিন নানা প্রয়োজন মেটাতে পাকশী, সাহাপুর, রূপপুর ও ঈশ্বরদী শহরে গড়ে উঠেছে একাধিক বিপণিবিতান, আধুনিক শপিংমল, সুপার শপ, রিসোর্ট ও তারকা হোটেল। উন্নতমানের হাসপাতালও নির্মাণ করা হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পে কাজের সুযোগ পেয়েছেন কয়েক হাজার বেকার যুবক। তাদের ভাগ্য যেমন বদলে গেছে, তেমনি বদলে গেছে সামাজিক চিত্রও। বেড়েছে জমির দাম। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের। শুধু রূপপুর নয়, পার্শ্ববর্তী পাকশী, সাহাপুর ও ঈশ্বরদী শহরেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। পাল্টে গেছে জীবনচিত্র। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের পরিচালক সৈকত আকবর জানান, এই প্রকল্পে দেশী-বিদেশী ২৫ হাজার প্রকৌশলী-শ্রমিক সর্বদা কাজ করছেন। রাশিয়া, বেলারুশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় দুই হাজার বিদেশি শ্রমিক ও কর্মকর্তারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। বাকিরা এ দেশের।

ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়র ইসহাক আলী মালিথা বলেন, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানে এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে না, এখানে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে। রূপপুরের নাম এখন আন্তর্জাতিক মহলে। রাশিয়ানদের পদচারণায় রূপুপর যেন একখন্ড রাশিয়াপল্লিতে পরিণত হয়েছে। সর্বদা এমন পদচারণায় মুগ্ধ হয়েছেন।

ঈশ্বরদী উপজেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব মোস্তাক আহমেদ কিরণ বলেন, অভাব-অনটনের কারণে আগে এসব গ্রামে প্রায়ই পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, দেনা-পাওনার নালিশসহ নানা ধরনের কলহ নিরসন করতে বিচার সালিস করতে হতো। বেকারত্ব দূর হওয়ায় গ্রামে এখন আর সে পরিবেশ নেই। পারিবারিক, সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরেছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের পদচারণা রয়েছে এখানে। সব মিলে রূপপুর এখন যেন রুশ নগরীতে পরিণত হয়েছে। পশ্চিম রেল পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) শাহিদুল ইসলাম জানান, রূপপুর প্রকল্পের ভারী যন্ত্রপাতি রেলপথে আনা-নেওয়ার জন্য ৩৩৫ কোটি টাকা খরচে ২৬ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পার হলেও সেটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে উদ্যোগটিতে গতি আসে। চুক্তি হয় রাশিয়ার সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পুরোদমে কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর।

Facebook Comments Box